
আল্লাহকে পেতে মাধ্যম গ্রহণ
আমাদের প্রতি আল্লাহর অসীম ভালোবাসার একটি প্রমাণ হচ্ছে, তাঁর কাছে চাইবার জন্য কোনো মাধ্যম গ্রহণ করাকে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। সৃষ্টিকে তিনি এতই ভালোবাসেন যে, বান্দারা তাঁকে ডাকবে, কিন্তু কারো মাধ্যম হয়ে বলবে, ‘হে আল্লাহ্, তার ওছিলায় আমার দুয়া কবুল করো’, এমন কাজ তাঁর ইজ্জতের সাথে সাংঘর্ষিক।
.
ইসলাম তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর তাওহীদ কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। আমাদের কাজে কর্মে, সবকিছুতে একত্ববাদের স্বীকারোক্তি দাবী করে ইসলাম। ভিন্ন ধর্মগুলোর সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্যটা এখানেই; ইসলামে স্রষ্টার ধারণা একদম নিখুঁত, মানবীয় ত্রুটির মুক্ত এমন এক সত্ত্বা, যার গুণে, কর্মে কারো সাথে কোনো সদৃশতা নেই, অংশীদার নেই।
.
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. ‘আল্লাহকে পেতে মাধ্যম গ্রহণ’ এই প্রবন্ধে এই বিষয়র-ই যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন নুসুস এবং যুক্তির আলোকে, খণ্ডন করেছেন তাদের দাবীগুলো যারা বলে আল্লাহকে পেতে মাধ্যম লাগে।
Original price was: 60৳ .42৳ Current price is: 42৳ .
একই বিষয়ে আরও দেখুন...
রিভিউ এবং রেটিং
আপনার রিভিউটি লিখুন
আল্লাহকে পেতে মাধ্যম গ্রহণ
| 5 star | 100% | |
| 4 star | 0% | |
| 3 star | 0% | |
| 2 star | 0% | |
| 1 star | 0% |













📚 বই পর্যালোচনা- ৫
📖 আল্লাহকে পেতে মাধ্যম গ্রহণ
✍️ : শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবনে আব্দুল হালীম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ
📝 অনুবাদক: ড. আবুবকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে মাধ্যম গ্রহণের ইসলামিক ধারণার একটি গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। এটি শরিয়ত-সমর্থিত এবং শরিয়ত-নিষিদ্ধ মাধ্যমের (অসীলা) মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। প্রধান বক্তব্য হলো, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্য শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত মাধ্যম, যেমন ঈমান, সৎ আমল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণ গ্রহণ করা অপরিহার্য। এর বিপরীতে, মৃত ব্যক্তি, নবী বা ফেরেশতাদেরকে সুপারিশকারী বা প্রয়োজন পূরণকারী হিসেবে মাধ্যম বানানোকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুস্পষ্টভাবে শিরক (আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপন) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপ। পার্থিব রাজার কাছে পৌঁছানোর জন্য যেমন মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে সেই উপমাটি প্রযোজ্য নয়, কারণ আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আল্লাহ্র কাছে সরাসরি ইবাদত ও দোয়া করাই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা, এবং এটাই মুক্তির একমাত্র পথ।
মাধ্যম গ্রহণের ধারণা ও বিভক্তি: স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম বা অসীলা গ্রহণ করার বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে অনেকে এমন সব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় যা ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে মানুষকে প্রধানত তিনটি দলে বিভক্ত করা যায়:
১. শরিয়তপন্থী দল: তাঁরা শুধুমাত্র সেইসব মাধ্যমকেই গ্রহণ করেন যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, যেমন; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) প্রতি ঈমান এবং শরিয়তসম্মত আমল।
২. সীমালঙ্ঘনকারী দল: এই দল মাধ্যম বা অসীলার ধারণার ভুল ব্যাখ্যা করে এবং এমন কিছু বিষয়কে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে যা ইসলামে অনুমোদিত নয়। তারা নবী-রাসূল ও নেককার ব্যক্তিদের ব্যাপারে এমন বিশ্বাস পোষণ করে যা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছায়। তারা মনে করে যে, এই মাধ্যমগুলো ছাড়া আল্লাহ্র কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
৩. দর্শন ও ইলমুল কালামপন্থী দল: তারা শরিয়তের বিষয়গুলোকে নিজেদের যুক্তি ও দর্শন দ্বারা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে এবং প্রায়শই মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়।
শরিয়ত-সমর্থিত মাধ্যম (বৈধ অসীলা): কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্য কিছু মাধ্যম বা অসীলা নির্ধারণ করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ বৈধ। এই মাধ্যমগুলো ইবাদতেরই অংশ। আল্লাহ্ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্যের জন্য অসীলা (মাধ্যম) অন্বেষণ কর এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩৫)
এখানে অসীলা বলতে শরিয়ত-সমর্থিত উপায় বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
আল্লাহ্র প্রতি ঈমান ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) আনুগত্য: এটিই আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
সৎ আমল: শরিয়ত নির্দেশিত যেকোনো ভালো কাজ, যেমন সালাত, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উপায়।
আল্লাহ্র সুন্দর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে দোয়া করা: আল্লাহ্র কাছে তাঁর গুণবাচক নাম উল্লেখ করে প্রার্থনা করা একটি উত্তম অসীলা।
জীবিত পুণ্যবান ব্যক্তির কাছে দোয়ার আবেদন: কোনো জীবিত নেককার ব্যক্তির কাছে নিজের জন্য দোয়া চাইতে বলা জায়েজ। যেমন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য দোয়া করিয়েছিলেন।
শরিয়ত-নিষিদ্ধ মাধ্যম ও শিরকের ধারণা: ইসলামে এমন কিছু মাধ্যম গ্রহণের ধারণা প্রচলিত আছে যা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের মাধ্যম গ্রহণের মূল কারণ হলো আল্লাহ্র ক্ষমতা ও গুণাবলী সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ভুল উপমা ও যুক্তির অনুসরণ।
নিষিদ্ধ মাধ্যমসমূহ;
★ মৃত নবী, অলী বা ফেরেশতাদের আহ্বান: আল্লাহকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তি বা অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের সুপারিশকারী মনে করা বা তাদের মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা বড় শিরক।
★ সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা: অনেক মানুষ পার্থিব রাজা-বাদশাহদের উদাহরণ দিয়ে বলে যে, যেমন রাজার কাছে পৌঁছাতে মন্ত্রী বা সুপারিশকারীর প্রয়োজন হয়, তেমনি আল্লাহ্র কাছে পৌঁছাতেও নবী-অলিদের মাধ্যম প্রয়োজন। এই তুলনাটি বিভিন্ন কারণে বাতিল:
১. অজ্ঞতা ও অক্ষমতা: রাজা তার প্রজাদের অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না, তাই তাঁর সহায়তাকারীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহ্ সবকিছু জানেন, শোনেন এবং দেখেন। তাঁর কোনো কিছুই অজানা নয়।
২. দুর্বলতা: রাজা প্রজাদের প্রয়োজন একা পূরণ করতে অক্ষম, তাই তাঁর সাহায্যকারী দরকার। কিন্তু আল্লাহ্ কারো মুখাপেক্ষী নন, বরং সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।
৩. ব্যক্তিগত সম্পর্ক: রাজার সাথে প্রজাদের ব্যক্তিগত অনুরাগ বা বিরাগের সম্পর্ক থাকতে পারে, যা তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আল্লাহ্ হলেন পরম ন্যায়বিচারক, এবং তিনি সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন এবং তাদের আমলের কারণেই পুরস্কৃত করেন।
শিরকের ভয়াবহতা: নিষিদ্ধ মাধ্যম গ্রহণ করা আল্লাহ্র সাথে শিরক করার শামিল। মুশরিকরা বিশ্বাস করত যে তাদের উপাস্যরা আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করে তাদের নৈকট্যশীল করে দেবে। আল্লাহ্ তাদের এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন: “জেনে রেখ, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহ্রই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভে সাহায্য করবে’।” (সূরা আয-যুমার: ৩)
কুরআন ও হাদিসে শিরককে সবচেয়ে বড় গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না যদি ব্যক্তি তা থেকে তওবা না করে মারা যায়।
শাফা’আত (সুপারিশ): অনুমোদিত বনাম নিষিদ্ধ;
শাফা’আত বা সুপারিশের বিষয়টি মাধ্যম গ্রহণের বিতর্কের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। শাফা’আতের দুটি প্রকার রয়েছে:
১. শরিয়ত-সমর্থিত শাফা’আত: এটি কিয়ামতের দিনে ঘটবে। এই শাফা’আতের জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
আল্লাহ্র অনুমতি: আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দেবেন, কেবল তিনিই সুপারিশ করতে পারবেন।
যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি: আল্লাহ্ কেবল সেই ব্যক্তির জন্য সুপারিশ গ্রহণ করবেন যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আল্লাহ্ বলেন: “কে আছে এমন, যে তাঁর (আল্লাহ্র) অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)
২. শরিয়ত-নিষিদ্ধ শাফা’আত: দুনিয়াতে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফা’আত বা সুপারিশ চাওয়া নিষিদ্ধ। মৃত ব্যক্তি বা কোনো সৃষ্টির এই ক্ষমতা নেই যে তারা আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়া কারো জন্য সুপারিশ করতে পারে। মুশরিকরা এই বিশ্বাসেই তাদের মূর্তিদের পূজা করত।
উপসংহার: এটি সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্কে পাওয়ার জন্য মাধ্যম বা অসীলা গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলাম একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ পথনির্দেশনা দিয়েছে। বৈধ অসীলা হলো ঈমান ও সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্র আনুগত্য করা এবং তাঁর কাছে সরাসরি প্রার্থনা করা। অন্যদিকে কোনো সৃষ্টিকে চাই তিনি নবী, অলী বা ফেরেশতা হোন আল্লাহ্ ও বান্দার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করা তাদের কাছে সাহায্য বা সুপারিশ চাওয়া একটি গর্হিত কাজ এবং সুস্পষ্ট শিরক। পার্থিব রাজা-বাদশাহর সাথে মহান স্রষ্টার তুলনা একটি ভ্রান্ত যুক্তি, কারণ আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ। একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো সকল প্রকার নিষিদ্ধ মাধ্যম বর্জন করে শুধুমাত্র এক আল্লাহ্র ইবাদত করা এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, যেমনটি শিখিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)। এটাই তাওহীদের মূল ভিত্তি এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি।