
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ
“ইসলামের নামে জঙ্গীবাদ : আলোচিত ও অনালোচিত কারণসমূহ ” বইয়ের সংক্ষিপ্ত কথা
আমাদের সমাজের সকল মানুষ এবং ইসলাম সম্পর্কে যাদের সামান্য জ্ঞানও আছে তারা সকলেই জানেন যে, জাতি, ধর্ম , বর্ণ , গোত্র নির্বিশেষে সমাজের সকল মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের অন্যতম প্রেরণা । তাত্ত্বিক , প্রায়োগিক ও ঐতিহাসিকভাবে তা সর্বজনবিদিত । বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সকল মানুষই ধর্মীয়ভাবে শান্তিপ্রিয় । সবাই আমরা শান্তি চাই । এখন সমস্যা হলো, তাহলে ইসলামের নামে বোমাবাজি , অশান্তি , নিরিহ নিরপরাধ মানুষ হত্যা, আত্মহত্যা ইত্যাদি কেন ঘটছে ? এ সকল ঘটনার কারন জানা শুধু কৌতূহল নিবারণের বিষয় নয়, বরং সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় । সন্ত্রাস একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি । এর নিরাময়ের জন্য এর সঠিক কারন নির্ণয় করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ । সঠিক কারন নির্ণয় এই ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের পথ সুগম করে । পক্ষান্তরে এর কারন নির্ণয়ে বিভ্রান্তি সমস্যাকে আরো ভয়ঙ্কর করে তুলতে পারে ।
Original price was: 260৳ .174৳ Current price is: 174৳ .
একই বিষয়ে আরও দেখুন...
রিভিউ এবং রেটিং
আপনার রিভিউটি লিখুন
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ
| 5 star | 100% | |
| 4 star | 0% | |
| 3 star | 0% | |
| 2 star | 0% | |
| 1 star | 0% |











































📚 বই পর্যালোচনা-৪
📖 ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ
✍️ লেখক : প্রফেসর ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহিমাহুল্লাহ)
লেখক পরিচিতিঃ প্রফেসর ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন বাংলাদেশের এক প্রখ্যাত আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও দাঈ। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও সমকালীন ইসলামী চিন্তার ওপর বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কিছু রচনাবলী, কোরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, হাদিসের নামে জালিয়াতি, রাহে বেলায়াত সহ আরো অনেক বই রয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল যুক্তিনির্ভর, সহজবোধ্য ও আহলুস সুন্নাহর মানহাজভিত্তিক। সাধারণ পাঠকরাও তাঁর বই পড়ে জটিল ইসলামী বিষয় সহজে বুঝতে পারেন। আধুনিক যুগে ইসলাম পালনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি সবসময় বাস্তবধর্মী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি অতিরঞ্জন ও পক্ষপাত থেকে দূরে থেকে সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন।
বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং এই সংক্রান্ত দ্বিমুখী বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা করা। লেখক মূলত ‘ইসলামী আইন ও বিচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধের সঙ্গে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে এটিকে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেছেন।
বইটিতে প্রথমত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। ইসলামের শান্তি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ এবং সকল সৃষ্টির জন্য। এটি একটি সর্বজনবিদিত বিষয় যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের অন্যতম প্রেরণা।
বইটিতে জঙ্গিবাদকে একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে উল্লেখ করেছেন যে, কিছু বিভ্রান্ত বিপথগামী মানুষের কারণে ঢালাওভাবে ধার্মিক ও আলেম সমাজকে দায়ী করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা চুরি, ডাকাতি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে কেউ স্কুল-কলেজ বা শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেন না; কিন্তু দু-চার জন বিপথগামী টুপি মাথায় দিয়ে সন্ত্রাস করলে সকল টুপিওয়ালাকেই দায়ী করা হয়।
বইটি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সংজ্ঞা ও প্রকারণ আলোচনা করেছে। এতে ইরাক, ফালুজা এবং ফিলিস্তিনে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমের মাধ্যমে সন্ত্রাস সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
বইটি মূলত এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজে যে, বর্তমান সমাজে ইসলামের নামে বোমাাবাজি, অশান্তি, নিরীহ মানুষ হত্যা ও আত্মহত্যা কেন ঘটছে?
এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ–
১. সঠিক কারণ নির্ণয়: সন্ত্রাস একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি, এবং এর নিরাময়ের জন্য এর সঠিক কারণ নির্ণয় করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক কারণ নির্ণয় এই ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের পথ সুগম করে।
২. বিভ্রান্তি নিরসন: ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলোতে ইসলামকে সন্ত্রাসের জনক বলে চিত্রিত করা হচ্ছে, যা ইতিহাস ও বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ভুল ধারণার নিরসন করা জরুরি।
৩. উদ্দীপনা এবং আবেগের অপব্যবহার: জঙ্গিবাদ বিষয়ক প্রচারণার কারণে কিছু সংখ্যক যুবক শুধুমাত্র ইসলামের আবেগে তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে মুসলিম দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা বহিশত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
৪. উম্মাহর ঐক্য রক্ষা: সমস্যার কারণ নির্ধারণে বিভ্রান্তি প্রায়শই সমস্যাকে উসকে দিতে পারে। জঙ্গিবাদের জন্য ইসলাম বা ইসলামিক শিক্ষাকে দায়ী করলে তা সংঘাতকে উসকে দেবে এবং সন্ত্রাসীদের প্রতি এক প্রকারের ‘সহমর্মিতা’ সৃষ্টি করবে।
৫. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসলামী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের নিজেদের দেশে ইসলামের নীরব বিস্তৃতি (ইসলামায়ন) রোধ করতে জঙ্গিবাদ ইস্যুকে সর্বোত্তম বিবেচনা করে এবং তাদের স্বার্থেই ‘জঙ্গিবাদ’ সৃষ্টি করে।
বইটির শক্তিশালী দিকগুলোর মধ্যে নিম্নলিখিত প্রধান বিষয়গুলোঃ
১. ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ
বইটি ইসলামে চরমপন্থার আবির্ভাবকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেছে, যা এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর অন্যতম।
খারেজি সম্প্রদায় ও ভবিষ্যদ্বাণী: লেখক ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরি শতাব্দীতে আবির্ভূত খারেজি দলের ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন। এই দলের বৈশিষ্ট্য (যেমন: বয়সের তরুণ, ধর্মপালনে নিষ্ঠাবান, কিন্তু অপরিণত বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার অভাব) এবং তাদের বিশ্বাস (যেমন: বড় পাপের কারণে মুসলমানকে কাফির বলা) আধুনিক জঙ্গিদের বিশ্বাসের সাথে আশ্চর্যজনক মিল দেখায়।
তাৎক্ষণিক ফললাভের মানসিকতা: জঙ্গিদের দ্রুত ফলাফল লাভের (দ্রুত বিজয়) অস্থির মানসিকতাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। এটি কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জিহাদ ও কিতাল বিষয়ক ভুল ধারণা খণ্ডন: জঙ্গিবাদ প্রসারের মূল কারণগুলির মধ্যে একটি হলো জিহাদ সংক্রান্ত ভুল ব্যাখ্যা। বইটি স্পষ্ট করেছে যে, পারিভাষিক অর্থে ‘জিহাদ’ মানে হলো রাষ্ট্র ও দা’ওয়াতের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ (কিতাল), যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অবৈধ।
তাগুত ও তাকফিরের কঠোর বিশ্লেষণ: লেখক প্রমাণ করেছেন যে, পাপের কারণে কোনো মুমিনকে কাফির বলার (তাকফির) প্রবণতা খারেজি সন্ত্রাসের মূল ভিত্তি ছিল। এই বইটি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মতবাদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে জোর দেওয়া হয়েছে যে, মুমিনকে কাফির বলার চেয়ে ভুল করে কোনো কাফিরকে মুসলিম মনে করাও নিরাপদ।
২. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উন্মোচনঃ
বইটি জঙ্গিবাদের জন্ম ও বিস্তারের জন্য কেবল ধর্মীয় আবেগকে দায়ী না করে, বরং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উন্মোচন করেছে।
পশ্চিমা দ্বৈত নীতি: এটি দৃঢ়ভাবে দেখিয়েছে যে ফিলিস্তিন, ইরাক এবং অন্যান্য স্থানে সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতি, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং নীরব সমর্থন জঙ্গিবাদ সৃষ্টিতে ইন্ধন যোগায়। যখন মানুষ অত্যাচারের প্রতিবাদে আইনগতভাবে কিছু করতে পারে না, তখন প্রতিহিংসার আবেগ জঙ্গিবাদকে জন্ম দেয়।
মাদ্রাসা শিক্ষা বিতর্ক নিরসন: জঙ্গিবাদে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ স্কুল-শিক্ষিতদের চেয়ে আনুপাতিক হারে অনেক কম। লেখক প্রমাণ করেছেন যে জঙ্গিবাদে জড়ানো ব্যক্তিরা সাধারণত সঠিক ইসলামী জ্ঞানের অভাবে প্রভাবিত হয়, এবং প্রতিষ্ঠিত কোনো মাদ্রাসা থেকে অস্ত্র উদ্ধার বা গ্রেফতারের কোনো রেকর্ড নেই।
৩. সংশোধন ও দাওয়াহর সঠিক পদ্ধতিঃ
বইটি জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণের জন্য আলেম সমাজ এবং রাষ্ট্রের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে:
অহিংস পথ অবলম্বন: ইসলামে সর্বদা সহিংসতা ও সীমালঙ্ঘন বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি দা’ওয়াতের ক্ষেত্রেও উত্তম আচরণের মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধ করতে বলা হয়েছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং বিজয়ের একমাত্র পথ হলো ‘অহিংস’ এবং ‘মন্দের মোকাবিলায় উৎকৃষ্টতর’ আচরণ।
রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বজায় রাখা: চরমপন্থার বিরুদ্ধে এটি একটি মূলনীতি যে, শাসন বা বিচারব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলেও (যদি শাসক সালাত আদায় করেন) রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বর্জন করা বা বিদ্রোহ করা নিষিদ্ধ। এটি সাহাবী ও তাবেয়ীদের কর্মধারা দ্বারা প্রমাণিত।
আলেমদের ভূমিকা: জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আলেম সমাজের যুক্তিসঙ্গত ও তথ্যভিত্তিক তাত্ত্বিক আলোচনা অপরিহার্য। আলেমদের নিজেদের মধ্যে শত্রুতা ও দলাদলি এড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত, কারণ বিভক্তি চরমপন্থার পটভূমি প্রসারিত করে।
কঠোর ভাষা বর্জন: এটি মুমিনদেরকে দলাদলি, নিন্দা এবং মন্দ উপাধিতে ডাকা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়। এমনকি চরম জালেম ফিরআউনের সঙ্গেও মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ)-কে নরম ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
উপসংহারঃ সবমিলিয়ে, বইটি ইসলামের নামে জঙ্গিবাদকে একটি ধর্মীয় আদর্শের বিকৃতি, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এবং আবেগপ্রসূত অপরিণত চিন্তাভাবনার ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা কোরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীদের কর্মধারার গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বইটি চরমপন্থার মানসিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শেকড় উন্মোচন করে বিকল্প ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। তবে এটি যতটা প্রচার ও প্রসারের দরকার ছিল ততটা প্রচারের আলো পায়নি, কারণ এতে অনেকের ভুল ধারণা ভেঙে যায় এবং এটি কোনো কোনো পক্ষের প্রচারণার সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে এটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শক্তিশালী হলেও সাধারণ পাঠকের কাছে কম পরিচিত রয়ে গেছে।